পয়লা বৈশাখের পাঁচ রকম…

একটা বছর ঘুরে আবার এসে গেল – কাঠফাটা গরমে এক ঝলক মিষ্টি হাওয়ার মতো, টানা মাসের পর মাস ঘাড় গুঁজে কাজ করে যাওয়ার পরে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলা একটা বন্ধের দিনের মতো, দিনের পর দিন ডায়েটিং করতে করতে হঠাৎ এক প্লেট বিরিয়ানি খাবার মতো, একঘেয়ে জীবনের স্বাদ বদলাতে একটা নিটোল খুশির দিন – বাংলা নববর্ষ, পয়লা বৈশাখ, আমাদের এক-লা বৈশাখ |

পয়লা বৈশাখ বলতে কি বোঝো – একেকজনের একেক রকম মত | গড়পড়তা হিসেব ধরে, তার সঙ্গে নিজের ২ যোগ দিয়ে মোটামুটি এই গোটা পাঁচেক-এ নামানো গেছে – উপাদান, উপকরণ, উপসর্গ…

কেনাকাটা

সত্যি করে বলুন তো কোন দুটো জিনিসের কথা প্রথমেই মাথায় আসে? আমি জানি – নাইটি আর বিছানার চাদর ! অন্য আরো অনেক কিছুই কেনা হতো – কনিষ্ক থেকে ছাপা শাড়ী, নারী সেবা সংঘের সুতির ফ্রক, খাদি গ্রামোদ্যোগ থেকে পাঞ্জাবি; কিন্তু চৈত্র সেলের কেনাকাটা বললেই মনে আসে বিকেল চারটের ঠা ঠা রোদে গড়িয়াহাটের দুই ফুটপাথের এমাথা থেকে ওমাথা জুড়ে ঝুলে থাকা রাশি রাশি নাইটি আর শ’য়ে শ’য়ে বেডশীট, বেডকভার, বালিশের ওয়াড় ! আর ভিড় ! সেই ভিড় ঠেলে যে না ঘুরেছে তাকে বোঝানো যাবে না সে নিদারুণ অনুভূতি ! সারা কলকাতা ভেঙে পড়েছে সম্বচ্ছরের বাড়ির জিনিসপত্র একটু সস্তায় কিনে নিতে | দরদর করে ঘাম গড়াচ্ছে কপাল বেয়ে, মুছে নেবার জন্য হাত তোলার ফাঁকটুকু পাওয়াও দুষ্কর; নদী নামছে ঘাড় বেয়ে, পিঠ বেয়ে… তবু যেতাম, মা-র সাথে, দিদুনের সাথে – জেদ করে, ঘ্যানঘ্যান করে, লোকের কোমরের চাপে চিঁড়েচ্যাপ্টা হতে | বুক ধুকপুক আশা, ফেরার সময় পেতে পারি নির্মল বুক এজেন্সির “ভয়ঙ্কর শিকার কাহিনী”, এক কৌটো মিষ্টি সুপুরি ( এখন অবিশ্বাস্য মনে হলেও একটা গোটা দোকান ছিল মিষ্টি সুপুরির, গড়িয়াহাট মোড়ের কাছেই ), একটা ভ্যানিলা আইসক্রিম কোন !

আজকাল এই যে সব জিনিস আমরা অনলাইন কিনছি, শাড়ী-ব্লাউজ থেকে শুরু করে পর্দা-বালিশের ওয়াড় পর্যন্ত, তাতে কি এই ভিড়টা কমেছে ? একটুও ?

পুজো-হালখাতা

প্রধানত: মা-র নামে চিঠি আসতো, বহুদিনের চেনা সোনার দোকান, শাড়ীর দোকান থেকে, হালখাতার নিমন্ত্রণ | পুরোনো গল্পের বই আর বাবার মুখে শুনেছিলাম দোকানে ঘুরে ঘুরে মিষ্টি খেয়ে হালখাতা করার কথা | বলাই বাহুল্য, জিনিসটা তখন আর তত আকর্ষণীয় মনে হয়নি |

Poila Boishakh 01এই হালখাতার পুজোর জন্যেও বটে, তাছাড়া অনেকেই নতুন বছরের শুরুতেই আগাম পাপস্খালন করে রাখতে চান বলেও বোধহয়, এইদিনে ছোট বড় মাঝারি সব কালীবাড়িতে ( হ্যাঁ, স্পেশালি কালীবাড়িতেই !!! ) মানুষ-মারা ভিড় হয় ! আমাদের বাড়ির পাশে লেক কালীবাড়িতে দেখেছি ভোরবেলা থেকে দুপুর ১২টা – ১টা অবধি একদিকের রাস্তা বন্ধ রাখতে হয়, ভিড় সামলাতে ! কালীঘাটের কথা তো ছেড়েই দিন, দক্ষিনেশ্বর মন্দিরেও তথৈবচ ! আমার মতে, বাকি ৩৬৪টা দিন যার কাছে হাত জোড় করেন, বছরের শুরুটাও নয় সেই বাড়ির ঠাকুরের পুজো করেই কাটালেন ! তবে আমার মতে কি বা আসে যায়…

খাওয়া দাওয়া

মেন পয়েন্টে এসে গেছি, গুরু ! বাঙালির উৎসব মানেই জম্পেশ খাওয়া দাওয়া ! তারওপর যেহেতু পয়লা বৈশাখ-এ আর বিশেষ কিছু করার থাকে না, তাই পুরো চাপটা এসে পড়ে একটা “কথা হবে না, বস” টাইপের মেনু নামিয়ে দেবার ওপর | দোকানের হাতছানি তো আছেই – ভুরিভোজ, মহাভোজ, কব্জি ডুবিয়ে খাওয়া, বনেদি বাড়ির খাওয়া, ঘরোয়া খাওয়া দাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি; আজকাল আবার সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট দেখে চোখ কপালে ওঠে ! “কর্তার জন্য নববর্ষের স্পেশাল মেনু বানিয়ে ফেললাম…” “বৌকে চমকে দিতে পয়লা বৈশাখের লাঞ্চ..” “নতুন বছরে বন্ধুদের সাথে খাওয়া দাওয়া…” – চার রকম মাছের পদ, মুরগির দুইরকম, তার মধ্যে একটা আবার ইতালিয়ান ! বাড়িতে বানানো মিহিদানা, ক্ষীরকদম, tiramisu, blueberry cheesecake ! অবাক করলি ভাই, কচি কচি ছেলেমেয়েগুলোর মধ্যে এত গুণও লুকোনো আছে ! আমজনতা বাঙালির পাতে পোলাও একটা থাকেই, একটু মিষ্টি মিষ্টি, পাঁঠাও চলে তবে মাছের আদরই বোধহয় বেশি, অন্তত আজকের জন্য | এরপর কাঁচা আমের চাটনি ( seasonal fruit বলে কথা ), পাঁপড় থাকলেও থাকতে পারে, এবং মধুরেণ সমাপয়েৎ | নববর্ষ স্পেশাল এক খিলি পান বা একটুকরো মুখশুদ্ধি মুখে ফেলে, একটা ফুরফুরে মেজাজের বই নিয়ে, কোলবালিশটা টেনে বিছানায় কাত | অচিরেই নিদ্রাদেবীর শুভাগমন !

বেড়ানো

আমার বেশ বড়বেলা পর্যন্ত নববর্ষে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি গিয়ে দেখা করে প্রণাম-শুভেচ্ছা বিনিময়ের চলটা বজায় ছিল | কর্তা পাটভাঙা পাঞ্জাবি, গিন্নি টাঙ্গাইল বা ঢাকাই, কুচো-কাঁচারা নতুন জামা, মিষ্টির বাক্স হাতে ট্যাক্সি থেকে নামতে দেখা যেত আদর্শ বাঙালি পরিবারকে | আর কিছু মনেপ্রাণে রোমান্টিক বাঙালি যেত হাওয়া খেতে – আউট্রাম ঘাটে গঙ্গার ধারে, ভিক্টোরিয়ার সামনে টাঙ্গায় চড়ে | দৃশ্যটা ভাবুন, হাওয়ায় সিল্কের শাড়ির আঁচল উড়ন্ত, খোঁপার গোড়েমালা থেকে ভেসে আসছে মৃদু সুগন্ধ, হাওয়াই শার্টের ঠোঁটে WILLS NAVY CUT, গালে হালকা Old Spice… আমি যে নিজেই মত্ত, জানিনা প্রেমের শর্ত… আহাহা ! দুত্তোর ! নিকুচি করেছে মল-মাল্টিপ্লেক্স আর বুটিক রেস্টুরেন্টের ! অন্তত আজকের জন্য – চলো একবার ফিরসে “সৌমিত্র-তনুজা” বন যায়ে হাম দোনো…

বৈঠক

নববর্ষ কেটে যাবে অথচ রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের গলায় পুরাতনী গানPoila Boishakh 02 শোনা যাবে না, এমনটা হতেই পারতো না | দূরদর্শনের সাদাকালো পর্দায় সাদা আল্পনার ওপর কলসিতে সাজানো রজনীগন্ধার গুচ্ছ ঘিরে রসিকজনের মজলিশে মধ্যমণি হয়ে বসতেন, মুখ খুললে বেনারসি জর্দার গন্ধটা যেন নাকে এসে লাগতো – টপ্পা, ঠুংরি, নাটকের গান, মাঝখানে মাঝখানে নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প !

এখনো হয় টিভির নানা চ্যানেলে, যোগ্য উত্তরসূরীরা আছেন, আড্ডাও ভালোই জমে, তবে বড্ড টানাপোড়েন যায় ! এদিকে শ্রীকুমারবাবুকে শুনতে গিয়ে ঐদিকে অজয়বাবু মিস, অনিন্দ্যর কথা শুনতে গেলে স্বাগতালক্ষী বাদ ! বাকিরা কে কি দেখছে কে জানে বাবা ! মনোবৈজ্ঞানিক চাপে থাকতে হয় !

কিছু কিছু জাঁদরেল সাংস্কৃতিক আবহাওয়াসম্পন্ন বাড়িতে ঘরোয়া বৈঠক আগেও হতো, এখনো হয় | হাতেগোনা বিশ-তিরিশ জন কাছের মানুষ, দু-একটা খুচরো বন্ধুর বন্ধু টাইপ | অচেনা ভাবের আড়ষ্টতা কাটিয়ে, সম্বলপুরী-গাদোয়াল-র’সিল্কের পাঞ্জাবির জবরজং আড়াল সরিয়ে মূল রসের স্রোতে ভাসতে পারলে এই অভিজ্ঞতা মনে থেকে যায় বহুদিন |

মিলিয়ে মিশিয়ে এইরকমই বাঙালির নববর্ষ | কোনোটা কম, কোনোটা বেশি | বছরভর নিজেকে ভুলে দৌড়াতে দৌড়াতে, একটা দিন শিকড়ের টানে ফিরে তাকানো, এইটুকুই |

সংহিতা

 

ছবি: www.rootsbd.com

2,964 total views, 3 views today

This entry was posted in Random Ramblings and tagged , , , , . Bookmark the permalink.

3 Responses to পয়লা বৈশাখের পাঁচ রকম…

  1. তীর্থ says:

    এক ঝটকায় ছোটবেলার কত কত কথা মনে পড়ে গেল … ভীষণ ভালো হয়েছে লেখাটা

  2. Mini Bose says:

    Chamatkar lekha as expected.

  3. Madhumati says:

    Phire dakha- purono din gulo mone koriye dilo.
    Boro bhalo laglo.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *