পুজোর খাওয়া দাওয়া

বাঙালির উৎসব মানেই খাওয়া দাওয়া | এখানে বাঙালি বলতে আমি পৃথিবীর আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা “জন্মগত” বাঙালি এবং বাংলার শহর-গ্রামের ভিন্ন ভাষাভাষী, অথচ “মনেপ্রাণে” বাঙালি – দুই-ই বোঝাচ্ছি | তাই বাঙালির প্রাণের উৎসব – দূর্গা পুজো – এসে গেল, অথচ এখনো খাওয়া দাওয়া নিয়ে দু কথা বলা হলো না, এটা ঠিক মেনে নেওয়া গেল না |

যারা মনে মনে ভাবছেন – “যাক, কষ্ট করে পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট ঘেঁটে অমুক রেস্টুরেন্ট, তমুক কাফে-র লিস্ট বানানোর খাটনিটা বাঁচলো”.. তাদের বলি পত্রপাঠ এইখানেই ইতি টানুন | এখানে স্ত্রী বা প্রেমিকাকে অবাক করে দেবার মতো, ছেলেমেয়েদের খুশি করে দেবার মতো, বন্ধুদের আড্ডাতে বড়াই করার মতো কোনো রেস্টুরেন্টের খোঁজ আপনাকে দেওয়া হবে না | ওগুলো পেতে হলে ওটুকু খাটনি আপনাকে করতেই হবে | বলে কষ্ট না করলে এক কাপ চা অবধি পাওয়া যায় না, তো কেষ্ট আর রাধা !!

আর এও বলি, ভালো লাগে পুজোর সময় ওই চেয়ার-ধরে-দাঁড়িয়ে-থাকা ভীড়ে, প্রাণ হাতে করে নাকে মুখে গুঁজে, পকেট খালি করে বিল চুকিয়ে বেরিয়ে আসতে ? কি খেলেন সাপ না ব্যাঙ, তাই আদ্ধেক সময় বোঝা যায় না ! ওটা শুধু মনকে সান্তনা দেওয়া – “আমি-ও অমুক দোকানে খেয়েছি” | ওরকম খাওয়ার কথা আমি বলছি না |

Durga Puja Thali

কারুর কারুর আবার নিজের বাড়িতেই দূর্গা পুজো হয় | সেইসব ভাগ্যমানেরা মায়ের প্রাতঃকালীন ফলাহার দিয়ে দিন শুরু ক’রে লুচি, কুমড়োর ছক্কা, ঘি-ভাত, নারকেল দিয়ে মুগ ডাল, গয়না বড়ি ভাজা, ছানার কোপ্তা, ক্রমে ক্রমে বাসন্তী পোলাও, পাকা রুই-এর দম, খেজুর আমসত্বের চাটনি, ছানার পায়েস, চন্দ্রপুলি… মানে সে এক সাংঘাতিক জায়গায় দাঁড়ি টানেন | এর মাঝখানে থাকে অষ্টমীর শোল মাছ পোড়া, নবমীর সাগর-দই ! আমি সেরকম খাওয়ার কথাও বলছি না |

শেষ কবে এরকম সকাল হয়েছে যেখানে ভাই-বোন বা বন্ধুদের সঙ্গে প্যান্ডেলে পৌঁছনোর তাড়ায় খেয়ালই হয়নি জলখাবারে লুচি ছিল না পরোটা ? রোদজ্বলা দুপুরে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে, গরমে ঘেমে নেয়ে অখ্যাত কোনো দোকানে বিরিয়ানি চাঁপ ভাগ করে খাওয়া ! Durga puja Luchiসন্ধ্যেবেলা আলো ঝলমলে রাস্তার দুপাশে সারি সারি দোকান থেকে মনমাতানো খোশবাই – রোল, চাউমিন, ফিশফ্রাই, ওধারে আলুকাবলি, ভেলপুরি, চাট, ফুচকা আর টিরি-রিং টিরি-রিং টিরি-রিং “কোল ডিংস কোল ডিংস” | রোজ দশ-কুড়ি-পঞ্চাশ-একশো টাকা করে পুজোর পার্বনি মিলতো কাকা-পিসি-মামা-মাসিদের কাছ থেকে | আমি তো তখন বড়লোক ! তার-ই মধ্যে টাকা বাঁচিয়ে মা-র জন্য পছন্দের আলুর দম বাড়ি নিয়ে যাওয়া, বেশি করে তেঁতুলজল আর লঙ্কাকুচি দেওয়া | ঝাল কমাতে আইসক্রিম !

সন্ধ্যেবেলাটা তোলা থাকতো প্রধানত সাজ দেখা এবং দেখানোর জন্য | কিছু মোক্ষম পুজো প্যান্ডেল ছিল এর জন্য বিখ্যাত | তখন খাওয়াটা হয়ে যেত গৌণ – ফুচকা, আইসক্রিম, খুউব চাপাচাপি করলে ফিশ রোল বা মটন চপ, এমন কিছু কখনোই নয় যাতে ঠোঁটের রং উঠে যায় বা বিশ্রী হাঁ করতে হয় (না, ফুচকা খাওয়ার হাঁ-টা বিশ্রী নয়, ওটা মিষ্টুন) ! এবং অতি অবশ্যই কোল্ড ড্রিঙ্কস, এক জায়গায় অনেকটা সময় কাটানোর অপ্রতিদ্বন্দী হাতিয়ার |

আমাদের খাওয়ার খেলাটা জমতো রাত বাড়লে | রাত্তির দুটোর সময় বিশাল হাঁড়ির তলা চেঁছেপুছে বিরিয়ানি খাওয়ার মজাই আলাদা, অথবা তিনটে ফিশফ্রাই কিনতে গিয়ে সঙ্গে শেষ দুটো ফিশ ফিঙ্গার ফ্রি-তে পাওয়া ! রাত বাড়ার সাথে সাথে চিলি চিকেনের স্বাদও বাড়তো ! মাঝখানে অবশ্য একবার বাড়ি ফিরে রাতের খাওয়া সেরে নেওয়া হয়েছে | মা অবস্থা বুঝে ঢালাও সেদ্ধ ভাতের ব্যবস্থা রাখতেন | সন্ধের সাজের ধড়াচুড়ো ছেড়ে হালকা পোশাকে নতুন করে সেকেন্ড ইনিংস খেলতে নামতাম |

দূর্গা পুজোর কদিন সন্ধেবেলার কলকাতা আর রাতের কলকাতা-র মধ্যে বিশেষ তফাৎ থাকে না | Durga puja Street foodরাস্তায় লোকের ঢল, চারিদিক আলোয় আলো, খাবারের দোকানের বাইরে কম-সে-কম পনেরো জনের লাইন | আমি নিজে রাত দেড়টায় দক্ষিণ কলকাতার এক বিখ্যাত কন্টিনেন্টাল রেস্তোরাঁর বাইরের রোয়াকে, পা ঝুলিয়ে বসে অপেক্ষা করেছি | আমার ছয় ফুট দু ইঞ্চি লম্বা বন্ধু আর পাঁচ ফুট লম্বা খুড়তুতো বোনের ফুচকা খাবার কম্পিটিশন দেখেছি রাত তিনটেয় (ড্র হয়েছিল, দুজনেই তেত্রিশটা ) |

সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী বাইরে বাইরে খেয়ে বেরালেও দশমী থেকে মনটা ঘরমুখো হয়ে যেত | আমাদের বাড়িতে দশমীর রাতে লুচি, ছোলার ডাল, লাবড়া আর বোঁদে খাওয়ার নিয়ম | খুব-ই লোভনীয় এবং অবশ্য-পালনীয় নিয়ম | মনে আছে দশমীর সকাল থেকে মা, কাকিমারা শুরু করতেন বিজয়ার খাবার বানানো – এলোঝেলো, মিষ্টি গজা, কুচো নিমকি আর চিড়েভাজা মিশিয়ে চানাচুর; নাড়ুর দায়িত্বে থাকতেন ঠাম্মা নিজে – নারকেল নাড়ু, তিলের নাড়ু, নারকেলের তক্তি… | অনেকেরই বিজয়া করার তাগিদটা থাকতো ওই বাড়ির কাকিমার পাঁঠার ঘুগনিটা কি রসগোল্লার পায়েসটা থাকা অবধি | অবশ্য একনিষ্ঠ মিষ্টির ভক্তরা বাছাবাছি করতো না – চমচম, ল্যাংচা থেকে গুজিয়া, সবই সমান ভক্তিভরে উড়িয়ে দিতো |

প্রবাসী পুজোর খাওয়া দাওয়া আবার একেবারে অন্য গল্প | যারা একদম সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়েছে, তাদের একরকম | প্রসাদের ফল কাটা থেকে ভোগের খিচুড়ি পোলাও রান্না, সবই নিজেরা | রন্ধন পটিয়সী গিন্নিরা তলে তলে কম্পিটিশনও লাগিয়ে দেন, এর হাতের মালাই কোফতা দারুন তো ওর নবরত্ন পোলাও যেন অমৃত, সে রসগোল্লা বানানোতে ময়রাকে ফেল পরিয়ে দেয় তো তার এগলেস চকলেট কেক-ই বা কম কিসে ? অনেক পুজোতে, ভক্তি-ভালোবাসা সহকারে বেকড ভেজিটেবল এবং পাস্তাও দিতে দেখা গেছে; কালাপানি পেরিয়ে মা-ও খাদ্যাখাদ্য সম্পর্কে অনেক মুক্তমনা !

Durga puja Bhog

যারা ঘরের কাছে থেকেও পরবাসে, তাদের খাওয়া-দাওয়ার চালচিত্রও পরিবর্তনশীল | আগে একেকটি ছোট-বড় শহরে পুজো হতো হাতে গোনা | শালপাতার বাটিতে ঠাকুরের রান্না ভোগের খিচুড়ি, আলুর দম খেয়েই ছুট ছুট মাসিমা কাকিমাদের স্টলে – সেখানে পাওয়া যেত বাড়ির মতো লুচি তরকারি, ফিশফ্রাই, পোলাও কষা মাংস, দুধপুলি, পাটিসাপ্টা, রসগোল্লা, পায়েস – নামমাত্র দামে | বাড়ি ছেড়ে পড়তে আসা কলেজ পড়ুয়া থেকে সদ্য সংসারপাতা কচি স্বামী-স্ত্রী, সবাই মুখিয়ে থাকতো এই কটা দিনের জন্য | আজকাল নামীদামী দোকানের রমরমা স্টলের ঠ্যালায় স্নেহময়ী মাসিমা-কাকিমার দল দূরে সরে গেছেন, যারাও আছেন তারা ব্যবসাটা ভালোই বোঝেন, দোকানের ফিশ ফ্রাই 120 টাকা হলে “বাড়ির তৈরী” অবশ্যই 135 টাকা |

আজকাল অকাল বোধনের গরমের ফুলকপি, শীতের পটলের সাথে সাথে সব রকম খাবারদাবারও সব সময় পাওয়া যায় | এই একই খাবার আমরা প্রায়সই খাই – বাড়িতে, দোকানে, এখানে সেখানে | তবু কি পুজোর সময় কিছু আলাদা মিশে থাকে ফুচকার জলে, চিকেন রোলের সস-এ, পোলাওয়ের গন্ধে, ভোগের খিচুড়িতে ?

থাকে | মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা আগেকার পুজোর দিনগুলোর স্মৃতি, পিছনে ফেলে আসা সময়টার ছায়া, হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর আভাস | সবার ওপর ছায়া দিয়ে থাকে চিরকালের চেনা, আশার, ভরসার মা দূর্গা-র মুখ |

সংহিতা

 

Photo courtesy: sharmilazkitchen.com; pinterest.com; kopili.wordpress.com; ladysfinger.com; bijoeeta choudhury;

4,418 total views, 3 views today

This entry was posted in Food, Happening, Random Ramblings and tagged , , , . Bookmark the permalink.

2 Responses to পুজোর খাওয়া দাওয়া

  1. Maitreyi Bose says:

    Awpurbo, awpurbo! Kee jay bhaalo laaglo, taa bhaashaa diye prokaash kawraa jaay na. Awntorer monthhito gobheer onubhuti tuku i praanbhoray onubhawb kawraa jaay Aamaader chhotobyala, Aar ektu bawro hoye othhaar byala moner modhhye chhto bawro dolaa diye jaacchay Ei bhaabay i tora aamaader praaner Kolkata ke toder bhalobashaa diye aro o haajaar bnaachiye raakh – ei kaamona kori. Praanbhawra bhaalobaasha Aar shubho kaamona roilo tor o Kolkata Colloquy’r shawkoler jonyo.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *